ডিজাইনারস’ ক্যারিয়ার রোডম্যাপ

01/24/2016

যত ডিজাইন তত ডিজাইনার মানে ভিন্ন ভিন্ন নাম এবং স্ব স্ব কাজের পরিসরে বিভিন্ন পদবী। এখন চারিপাশে অনেকগুলো বাজ ওয়ার্ড (buzz word) শোনা যায়। যেমন – মিনিমালিস্ট ডিজাইন, প্রোডাক্ট ডিজাইন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন, সিজি আর্ট, ডিজিটাল আর্ট, ইন্টারফেইস ডিজাইন, ডিজিটাল পেইন্টিং, প্রটোটাইপ, ওয়্যারফ্রেম, ইউএক্স ডিজাইন ইত্যাদি।

এগুলো আসলে কিছুই না। বলতে পার সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের জানা শোনা ডিজাইনের ক্ষেত্রে নতুন কিছু শব্দের সংযযোন এবং পরিবর্ধন। আগে যেমন একজন ডিজাইনারই প্রিন্ট এবং ওয়েব এর সব কাজ করত, এখন সেটা ভাগ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আর সেই ক্ষেত্র বিশেষে ডিজাইনারদের কাজও আলাদা হয়ে গেছে। এর ফলে ক্যারিয়ার এর রাস্তাটাও পছন্দ মতো বেছে নেয়াটা জটিল নয় সহজ হয়েছে বৈকি।

কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে অন্য জায়গায়। নতুনরা যারা এই সেক্টরে আগ্রহী হয় তাদের মধ্যে দেখা যায়, গ্রাফিক ডিজাইনার হবার আকাঙ্খা নিয়ে শেখা শুরু করে এবং ফটোশপ আর ইলাস্ট্রেটর শিখেই টু ডি, থ্রি ডি এনিমেশন, ফ্ল্যাশ ইত্যাদি সফটওয়্যার গুলোতেও ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটি দেখা গেছে যে এলোমেলোভাবে অনেক কিছু শিখতে গিয়ে শেখার সমুদ্রে হারিয়ে গেছে। একসময় হ্যাং হয়ে ফ্রাস্ট্রেশনে ভোগা শুরু হয় তারপর ফলাফল – “না আমাকে দিয়ে কিসসুটি হবে না।”
কিন্তু এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একটা সঠিক ক্যারিয়ার রোডম্যাপ নিয়ে যদি এগোনো যায় তাহলে পথটা হতে পারে কিছুটা শর্টকাট এবং তুলনামুলকভাবে সহজ।

চল তাহলে রোডম্যাপ নিয়ে এগিয়ে দেখা যাক তোমার জন্য সহজ ক্যারিয়ার পথ কোনটি।

ধরে নিচ্ছি তুমি একজন ডিজাইনার হতে চাও। যেহেতু এই ক্যারিয়ার গাইডলাইনটা মুলত একজন ডিজাইনারের জন্য তাই আমরা এখানে বিভিন্ন ডিজাইনারের একটা ক্যারিয়ারপাথ তৈরি করার চেষ্টা করব।

শুরুটা করতে হবে ডিজাইন শেখা দিয়ে। যে কোন ডিজাইনারের জন্য হাতে খরি হচ্ছে খাতা পেন্সিল। আগে খাতা পেন্সিলে আঁকাটা রপ্ত করতে করতে হবে। ঠিক আমরা যেমন ছোটবেলায় বিভিন্ন গ্রাম বাংলার ছবি, চেয়ার, টেবিল, মানুষের শেইপ ইত্যাদি আকতাম ঠিক সেরকম। সেই ছোটবেলার আকাআকির সুপ্ত প্রতিভাগুলোকে জাগিয়ে তুলতে হবে।ভুলে গেলে চলবে না যে ডিজাইন হচ্ছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে জড়িত একটা অবিচ্ছেদ্য বিষয়। চারিপাশে আমরা যা কিছু দেখি, যত রঙ, আকৃতি, বস্তু, অনুভূতি ইত্যাদি সব কিছুর মধ্যেই ডিজাইন আছে। আগে ডিজাইনের এই ছন্দটাকে রপ্ত করতে হবে তাহলে হাতে কলমে যেকোন ডিজাইন তৈরি করা আর কঠিন মনে হবে না।সেক্ষেত্রে এক্টু আধটু পড়াশনাও করতে হবে, বেশী বেশী ম্যাগাজন, বই, পত্রিকা এসবের ডিজাইনগুলোর দিকে চোখ বুলোতে হবে। প্রকৃতির মাঝে রঙের খেলাগুলোকে বুঝতে শিখতে হবে। কালারের সাথে একটা সখ্যতা তৈরি করতে হবে। আর যা কিছু দেখবে হাতে সেটা আকার প্রাক্টিস করতে হবে।

বেশ, হাতে কলমে আমরা ডিজাইনের থিওরি আর কন্সেপ্ট নিয়ে যদি রেডি হয়ে থাকি তাহলে আমরা এরপর সফটওয়্যার শিখার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারি। প্রথমেই আমরা জরুরী এবং শক্তিশালী দুটো গ্রাফিক্স এর সফটওয়্যার শিখে ফেলব সেটা হচ্ছে এডোবি ফটোশপ এবং এডোবি ইলাস্ট্রেটোর। এই দুটো টুলস আমরা যখন পুরোপুরি রপ্ত করে ফেলব তখন আমরা মাত্র রেডী হলাম ডিজাইনার হবার জন্য।

এখন আমরা ধাপে ধাপে এগুবো।

তোমার যদি স্কেচ এবং ড্রইং এ ভালো দক্ষতা থাকে তাহলে তুমি ভালো একজন ইলাস্ট্রেটর আর্টিস্ট বা ডিজিটাল আর্টিস্ট বা Digital Designer হতে পার। সারা বিশ্বে ভালো ইলাস্ট্রেটর আর্টিস্টদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।

একজন ফটোশপ বা ইলাস্ট্রেটর আর্টিস্ট বা ডিজিটাল আর্টিস্ট কি কি করতে পারে?

ক্যারেকটার আর্টিস্ট – কার্টুনের ক্যারেক্টারগুলো আকার জন্য অবশ্যই খুব ভালো ফ্রি হ্যান্ড স্কেচ এবং ড্রইং জানতে হবে। গেমিং আর্টিস্ট হয়ে গেম এর বিভিন্ন এলিমেন্ট ডিজাইন করতে পারবে। ফ্যাশন ডিজাইনার আর্টিস্ট হয়ে বিভিন্ন মডেল ডিজাইন করতে পারবে। ডিজিটাল পেইন্টার হয়ে পোট্রেট ডিজাইন, বিভিন্ন ওয়াল পেপার ডিজাইন করতে পারবে।

একজন স্টিল গ্রাফিক আর্টিস্ট (Graphic Artist) হয়ে তোমার যখন মনে হবে ডানা মেলে আরও এক্টু উড়তে ইচ্ছে করছে, তখন বুঝতে হবে তোমার এনিমেশন বা মোশন গ্রাফিক্স এর দিকে এগুনোর সময় হয়েছে।

একজন মোশন গ্রাফিক ডিজাইনার বা এনিমেটর বিভিন্ন এনিমেশন নিয়ে কাজ করে যেগুলো আমরা টিভিতে দেখতে পাই। যেমন বিভিন্ন ক্যারেকটার দিয়ে কোন কার্টুন, গেম, এডভারটাইজমেন্ট, ডকুমেন্টারি ইত্যাদি বানানো হয়। এই ট্র্যাক টাতে যদি ক্যারিয়ার গড়তে চাও তাহলে আগেই বলে নেয়া ভাল, প্রচুর সাধনা আর সময় নিয়ে তোমাকে প্রস্তুত হতে হবে আর সাথে লাগবে হাই কনফিগারেশনের পিসি, গ্রাফিক ট্যাব এবং বড় স্ক্রিনের মনিটর। যে সফটওয়্যারগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে – থ্রি ডি ম্যাক্স, এডোবি আফটার ইফেক্টস, জি ব্রাশ, এডোবি প্রিমিয়ার ইত্যাদি।
এনিমেশনের ট্র্যাকটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা ট্র্যাক। এটার পাশাপাশি আরও অনেক কিছু জানলে, করলে ভালো হতো এরকমটা মনে হতেই পারে। কিন্তু এক্সপার্ট হতে হলে যে কোন একটা বিষয়ের উপর হওয়া ভালো।

কিন্তু তুমি ঠিক করলে এনিমেশনে না গিয়ে তুমি ওয়েব বা প্রিন্ট মিডিয়াতে থাকতে চাচ্ছ। কারন তোমার ওয়েব ডিজাইন, প্রোডাক্ট ডিজাইন, ইন্টারফেস ডিজাইন এসব ভালো লাগে। সেক্ষেত্রে তুমি গ্রাফিক ডিজাইনার (Graphic Designer) হবার কথা ভাবতে পার। মনে রাখবে একজন গ্রাফিক ডিজাইনার প্রিন্ট এবং ওয়েব দুটো মিডিয়াতেই কাজ করতে পারে। তুমি গ্রাফিক ডিজাইনার হয়ে যে কাজগুলো করতে পারবে সেগুলো হচ্ছে – লোগো ডিজাইন করা, ব্র্যান্ড ডিজাইন করা, বিভিন্ন স্টেশনারি যেমন- বিজনেজ কার্ড, লেটার হ্যাড প্যাড, ক্যালেন্ডার, নোটবুক কভার, এছাড়াও বিল্বোর্ড, ব্যানার, লিফ্লেট, ব্রশিউর ইত্যাদি। আবার ইন্ডাস্ট্রিয়াল, আর্কিটেকচারাল, ইন্টেরিওর ডিজাইন করতে হলে গ্রাফিক ডিজাইনের উপর ভালো দক্ষতা থাকতে হবে। আর টুলস হিসেবে অটোক্যাড বা থ্রিডি সফটওয়ার গুলো শিখতে হবে।

এরপর আসি ভিজুয়্যাল ডিজাইনার (Visual Designer) হবার সম্ভাবনায়। ওয়েব এর জগতে ভিজুয়্যাল ডিজাইনার  শব্দটি দু’ তিন বছর যাবত বেশ শোনা যাচ্ছে। যখন শুধু ওয়েব এর জন্য তুমি কোন ডিজাইন করবে তখন তোমাকে বলা হবে ভিজুয়্যাল ডিজাইনার (Visual Designer)। তবে ভিজুয়্যাল ডিজাইনার আর গ্রাফিক ডিজাইনারের মধ্যে পার্থক্য কিন্তু খুবই সুক্ষ।

প্রশ্ন জাগতেই পারে, একটি কোমপানিতে যখন একজন গ্রাফিক ডিজাইনার কাজ করছে “typefaces, hierarchy, color, images, and placement to create a perfect product” তখন একজন ভিজুয়াল ডিজাইনারের কেন দরকার পড়ে? ভিজুয়াল ডিজাইনার যেটা করে সেটা হচ্ছে “কোন ডিজাইনের সামগ্রিক শিল্পরুচিসম্মত, সৌন্দর্যবোধ সংক্রান্ত এবং নান্দনিক দিকগুলোকে যত্নসহকারে তত্ত্বাবধান করে। গ্রাফিক ডিজাইনার ইউজারদের সাথে ইনফরমেশনের যোগাযোগ সৃষ্টি করে, আর ভিজুয়াল ডিজাইনার “focused on the look and feel of the product and brand, as well as being involved in conversation about what the site or product provides, and project goals.”

এরপরের ধাপটি হচ্ছে ইউজার ইন্টারফেইস ডিজাইনার

ইউজার ইন্টারফেস ডিজাইনার যেটা করে – কোন প্রোডাক্টের  ইন্টারফেইস টা ডিজাইন করে। যেমন হতে পারে কোন গেম এর ইন্টারফেস, ওয়েব সাইটের ইন্টারফেস বা মোবাইল অ্যাপের ইন্টারফেইস। আবার ইন্টারফেস ডিজাইনার কিন্তু কোন মুভির বা এনিমেশনেরও ইন্টারফেস ডিজাইন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার গ্রাফিক এবং ভিজুয়াল ডিজাইনের এক্সপারটাইজ লেভেল অনেক হাই হতে হবে।

ওয়েব ইন্টারফেইস ডিজাইনার বা একজন ইউ আই ডিজাইনার (User Interface Designer) যা করে –

Look and Feel নিয়ে কাজ করে :
Customer Analysis
Design Research
Branding and Graphic Development
User Guides/Storyline
Responsiveness and Interactivity নিয়ে কাজ করে :
UI Prototyping, Interactivity and Animation, Adaptation to All Device Screen Sizes, Implementation with Developer

উপসংহারে বলতে গেলে – “User Interface Design is responsible for the transference of a brand’s strengths and visual assets to a product’s interface as to best enhance the user’s experience.
User Interface Design is a process of visually guiding the user through a product’s interface via interactive elements and across all sizes/platforms. User Interface Design is a digital field, which includes responsibility for cooperation and work with developers or code.”

সবকিছুর একটা শেষ যেমন আছে, তেমনি মনে আসতেই পারে ডিজাইনার হবার শেষ কোথায়? শেখার কোন শেষ নেই। কিন্তু প্রতিটি জায়গায় পদবী বা ডেজিগনেশনের একটা শেষ আমরা সর্বত্র দেখতে পাই। আর ওয়েব এর জগতে ডিজাইনারদের সর্বচ্চ পদ যদি বলতে হয় তাহলে সেটা ইউ এক্স ডিজাইনার বলা যেতে পারে। (User experience design (UXD or UED) is the process of enhancing customer satisfaction and loyalty by improving the usability, ease of use, and pleasure provided in the interaction between the customer and the product.)

ইউএক্স ডিজাইনার হচ্ছে সে, যিনি গ্রাফিক ডিজাইন, ভিজুয়াল ডিজাইন, ইউ ডিজাইন এসব কিছু তো অবশ্যই জানবে, সাথে বাড়তি আরও কিছু বিষয় সম্পর্কে জানবে। যেমন – ইউজার রিসার্চ করা, ইউজার সাইকোলজি, ইউজার বিহেভিওর, সার্চ এক্সপেরিএন্স, কন্টেন্ট এনালাইসিস ইত্যাদি।

আরো বিশদভাবে বলতে গেলে ইউজার এক্সপেরিএন্স ডিজাইনার বা ইউ এক্স ডিজাইনার (UX Designer যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে সেগুলো হচ্ছে –

Strategy and Content:
Competitor Analysis, Customer Analysis, Product Structure/Strategy, Content Development

Wireframing and Prototyping:
Wireframing, Prototyping, Testing/Iteration, Development Planning, Execution and Analytics, Coordination with UI Designer(s), Coordination with Developer(s), Tracking Goals and Integration, Analysis and Iteration

সুতরাং ইউএক্স ডিজাইনার হচ্ছে একটি প্রোডাক্টের সামগ্রিক দিকে নিয়ে কাজ করা এমন একটি রোল যে “part marketer, part designer, part project manager এবং challenging and multi-faceted বিষয়গুলো নিয়ে দেখাশোনা করে।

“UX ডিজাইনার ক্যারিয়ার” সম্ভাবনা নিয়ে আরো জানতে পড়ুন।
Nilim Ahsan
CEO, Co founder
Userhub